ঢাকা , শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ , ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একটি সেতুর জন্য ৩০ বছর ধরে ভোগান্তি

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ৩০-১০-২০২৬ ০৩:৪২:৪৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ৩০-১০-২০২৬ ০৩:৪২:৪৫ অপরাহ্ন
একটি সেতুর জন্য ৩০ বছর ধরে ভোগান্তি ছবি : সংগৃহীত
মন্দিরঘোনা গ্রামটি দেশ-বিদেশে পরিচিত মারিয়া মান্দার গ্রাম হিসেবে। ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার এই গ্রামেই জন্ম জাতীয় দলের নারী ফুটবলার মারিয়ার।

গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নেতাই নদ। 

নৌকায় নদ পার হয়ে মারিয়া স্কুলে যেতেন মন্দিরঘোনার পাশের গ্রাম কলসিন্দুরে। স্কুল থেকে ফিরে আবার নদ পার হয়ে স্কুলটির মাঠে ফুটবল খেলতে যেতেন তিনি। সেই অর্থে কলসিন্দুর গ্রামও মারিয়ার গ্রাম।
 
শুধু মারিয়া নন, ভারতের মেঘালয় সীমান্তবর্তী গ্রাম কলসিন্দুর ও মন্দিরঘোনায় আরো অনেক নারী ফুটবলারের জন্ম। তাদের কল্যাণে গ্রামের মানুষ পান বিদ্যুৎ সংযোগ, কিন্তু গ্রামের খরস্রোতা নেতাই নদে তাদের একটি সেতুর দাবি পূরণ হয়নি ৩০ বছরেও।
 
স্থানীয়রা জানান, মারিয়াসহ কলসিন্দুরের স্কুলমাঠে অনুশীলন করা অন্তত ৯ জন নারী ফুটবলার জাতীয় দলে খেলেছেন। মারিয়াসহ কয়েকজন এখনো রয়েছেন জাতীয় দলে।

মারিয়াকে আদর্শ মনে করে নদপারের গ্রামগুলোর অনেক মেয়ে এখন ফুটবল খেলেন, কিন্তু নেতাই নদে সেতু না হওয়ায় তাদের অধিকাংশই কলসিন্দুর গ্রামে গিয়ে অনুশীলনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

কালের কণ্ঠকে মারিয়া বলেন, ‘আমাদের সময় আমরা কয়েকজন দিনে দুইবার, কখনো তিনবার নৌকায় নেতাই নদ পার হয়ে কলসিন্দুর স্কুলে গিয়েছি। ক্লাস শেষে বাড়ি গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার স্কুলমাঠে ফুটবল খেলতে গিয়েছি।’ 
 
তিনি বলেন, ‘নৌকার মাঝিও ছিল না। দুই পাড়ে বাঁধা থাকতো দড়ি।

সেই দড়ি টেনে টেনে নৌকা চলিয়ে যেতাম। এখন সময় বদলে গেছে। তবু একটি সেতু না হওয়া খুবই দুঃখজনক।’ 
মারিয়া আরো বলেন, ‘২০১৬ সাল থেকে আমি বিভিন্ন সময় সেতুর দাবি জানিয়ে আসছি। এখনো সরকারের উর্ধ্বতন কারোর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলে সেতুর কথা বলি।’ তিনি বলেন, ‘সেতু না হওয়ায় এখন মেয়েরা ফুটবল খেলতে যেতে চায় না। এছাড়া অসুস্থদের চিকিৎসা নিতে যাওয়ার সময় খুব অসুবিধায় পড়তে হয়।’ 

‘আমাদের দাবি, দ্রুত মন্দিরঘোনা-কলসিন্দুর গ্রামে নেতাই নদের ওপর একটি সেতু নির্মাণ করা হোক’- বলেন মারিয়া।

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, নেতাই নদটি বর্ষায় প্রচণ্ড খরস্রোতা হয়ে ওঠে। পাহাড়ি ঢলে ভারতের মেঘালয় থেকে পানি নেমে এসে অন্তত ২০টি গ্রাম তলিয়ে দেয়। ওই সময় নৌকায় করে নেতাই নদ  পার হওয়াও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

তারা জানান, এ পথ দিয়ে উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষের যাতায়াত ছিল। সেতু না হওয়ায় তারা এখন অনেক পথ ঘুরে অন্য পথেও যাতায়াত করে। এতে ভোগান্তি ও যাতায়ত খরচ বেড়েছে।

এদিকে, গত ৩০ বছর ধরে ওই এলাকায় নেতাই নদের ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে এলাকাবাসী। দাবির সপক্ষে বিভিন্ন সময় তারা কর্মসূচি পালন করেছে। সবশেষ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে মানববন্ধন করা হয়। এতে শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার  মানুষ অংশ নেন। 

বক্তরা বলেন, ভোগান্তি তো রয়েছেই, ভোগান্তির চেয়ে এখন বড় সমস্যা হলো সেতু না হওয়ায়  সামাজিক সম্পর্ক ও বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও পড়ছে বিরূপ প্রভাব। 

স্থানীয়দের ভাষ্য, নদের উত্তরপারের মন্দিরকোনা, পঞ্চনন্দপুর, বল্লভপুর, কাশিপুর, সানখলা, কমলপুর, তারাগড়া, ঘিলাগড়া, কড়ইগড়া, মাইজপাড়া ও আশপাশের গ্রামগুলোতে বিয়ের সম্বন্ধ এলেও যোগাযোগ  সমস্যার কারণে অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। 

তারা জানান, এক বছর আগে মন্দিরঘোনা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আজিজের দুই ছেলে মাদরাসায় যাচ্ছিল। পথে নদী পার হওয়ার সময় নৌকা থেকে পড়ে মারা যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সেতুর জন্য অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যায় না, বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় খুবই দুর্ভোগে পড়তে হয়।

এ ব্যাপারে ধোবাউড়া উপজেলা প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম মণ্ডলের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘যারা মানববন্ধন করেন, তাদের বলেন, সরকারের কাছ থেকে অনুমতি এনে দিতে। অনুমতি পেলে আমরা কাজ করে দেব।’

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ